শুক্রবার ১৬, জানুয়ারি ২০২৬

শুক্রবার ১৬, জানুয়ারি ২০২৬ -- : -- --

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির জবাবে পাল্টা হুমকি ইরানের

যাপ্র আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১৯ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ইরানে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, ধারাবাহিকভাবে মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে প্রথমে ব্যবসায়ীদের ডাকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে বিক্ষোভ শুরু হয়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা সরকারি স্থাপনা, নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয় ও মসজিদসহ বিভিন্ন স্থানে নজিরবিহীন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়।

বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৫০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআরএনজিও)। নিহতদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সি ৯ জন রয়েছে। আন্দোলন শুরুর পর থেকে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

এই বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্য সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি ইরানে হামলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এর জবাবে তেহরানও পাল্টা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার দাবি করেছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। এই দাবির মধ্যেই গতকাল ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারের সমর্থনে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। খবর জানিয়েছে বিবিসি, আলজাজিরা ও প্রেসটিভি।

সোমবার রাজধানী তেহরানসহ দেশের অধিকাংশ প্রদেশে সরকারের ডাকে স্থানীয় সময় দুপুর থেকেই সমর্থকরা রাস্তায় জড়ো হন। কিছু প্রদেশে সকাল থেকেই এ সমাবেশ শুরু হয়। সরকারি কর্মকর্তারা এই জনসমাগমকে ‘শত্রুর ষড়যন্ত্রের মুখে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির অকাট্য প্রমাণ’ হিসেবে তুলে ধরেন।

এদিকে উত্তেজনার মধ্যেও তেহরান-ওয়াশিংটনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য থামেনি। ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরান জানিয়ে দিয়েছে, তারা যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। গতকাল তেহরানে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, সহিংসতা সপ্তাহান্তে বেড়েছিল, তবে এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, দেশব্যাপী বিক্ষোভ ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংস ও রক্তাক্ত করে তোলা হয়েছে, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য একটি অজুহাত পান। কঠিন এই পরিস্থিতিতে ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, সংলাপের জন্যও প্রস্তুত।”

বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে কয়েকদিন ধরে ইরানজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়। তবে ধীরে ধীরে ইন্টারনেট চালু করার ইঙ্গিত দিয়েছেন আরাগচি। তিনি জানান, ইন্টারনেট পরিষেবা শিগগিরই চালু করা হবে এবং সরকার নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে এ বিষয়ে কাজ করছে।

বিক্ষোভের তৃতীয় সপ্তাহে এসে ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়ান ট্রাম্প। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তার হাতে “খুব শক্তিশালী বিকল্প” রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরোধী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলেও জানানো হয়।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, সুইজারল্যান্ডের মধ্যস্থতায় দুই দেশের যোগাযোগের চ্যানেল এখনো উন্মুক্ত রয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের ওপর যেন বলপ্রয়োগ না করা হয়, সে আহ্বান জানিয়েছে জার্মানি, ফিনল্যান্ড ও কানাডাসহ একাধিক দেশ। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সতর্ক করে বলেছে, প্রয়োজনে ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। ইইউর মুখপাত্র আনোয়ার এল আনুনি বলেন, “বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়নের পর আমরা নতুন, আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত।” উল্লেখ্য, এর আগেই পশ্চিমা দেশগুলো নানা অজুহাতে ইরানের ওপর শত শত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

তীব্র বিক্ষোভের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরান সরকার তেমন সমর্থন পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে চীন প্রকাশ্যে তেহরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে। মুখপাত্র মাও নিং বলেন, “আমরা সর্বদা অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছি এবং ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করেছি যে সমস্ত জাতির সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত হওয়া উচিত। আমরা সকল পক্ষকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আরও বেশি কিছু করার আহ্বান জানাই।”

এদিকে মার্কিন মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ১৮৬টি শহর ও ৩১টি প্রদেশে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয়, যার ফলে ৪৯৬ জন বিক্ষোভকারী নিহত হন এবং অন্তত ১০ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

Link copied!
Development by বিডি আইটি এজেন্সি