বুধবার ০৪, ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বুধবার ০৪, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ -- : -- --

গল্প: অনাগত

মারিয়াম সিনহা পূর্ণ

প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম

গ্রাফিক্স: যায়দিন প্রতিদিন

সূর্যের নতুন আলোয় চারপাশ ঝলমল করছে। উত্তরের হিমশীতল বাতাস কানের কাছে গুনগুনিয়ে কী যেন বলে যাচ্ছে। উঠানের স্যাঁতসেঁতে ভাবটা এখনও পুরোপুরি কাটেনি—হয়তো রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। তবে রোদের প্রখরতায় পরিবেশে খানিকটা পরিবর্তন এসেছে।

— বলি, লতু, কুমড়োর বড়িগুলো রোদে দিয়েছিস তো?

সামনের পিঁড়িতে একজন নারী বসে ছিলেন। বয়স আনুমানিক ত্রিশ–বত্রিশ। ফর্সা গায়ের রং রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। মুখটা ফ্যাকাসে, চোখের নিচে গভীর কালো দাগ—যেন ক্লান্তি সেখানে স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তুলেছে। গায়ে সাদামাটা একটি সুন্নতি পোশাক। তলপেট খানিকটা ফোলা—স্পষ্টই নতুন প্রাণের আগমনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

— ও দাদি, তোমারে কইছি না, আমার মায়েরে লতু-লতু করবা না। শুনতে ভালো লাগে না। আমার মায়ের নাম তরুলতা—বুঝলা? তরুলতা।

কথাগুলো বলল তরুলতার ছোট মেয়ে রাফা।

— আচ্ছা, দাদি না হয় আর লতু লতু করবে না। কিন্তু তুই আবার এই “কইছি” বলছিস কেন? এই "কইছি" কী রে? তোকে কতবার বলেছি, অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলবে না। শিক্ষকের মেয়ে হয়ে এভাবে কথা বললে কি মানায়?

কথাগুলো বলল বড় মেয়ে রাকা।

তরুলতা একজন সাহসী নারী। তাঁর স্বামী আনাস আকুঞ্জী—পেশায় ইমাম এবং মাদরাসার শিক্ষক। বড় মেয়ে রাকা আফরোজ দশম শ্রেণিতে পড়ে, আর ছোট মেয়ে রাফা আফরিন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। শাশুড়ি হেনা বেগম। এই পাঁচজন নিয়েই তাদের ছোট্ট সংসার।

তরুলতা হালকা বিরক্তির সুরে বললেন,
— আহ্! তোরা দু’জন আবার ঝগড়া শুরু করলি কেন? সারাদিন এত ঝগড়া ভালো লাগে না।

হেনা বেগম সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— দেখছো বৌমা? তোমার মাইয়া দুইটা আমারে কেমন ধরে। আমি তো বুড়ি মানুষ, এত শুদ্ধ করে কথা কইতে পারি না।

বাঁশের চাটার গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে আনাস সাহেব বললেন,
— কী হয়েছে মা? তোমাকে কে জ্বালাচ্ছে?

হেনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— আর কইস না বাবা! তোর ছোট মাইয়াটা বড্ড বিজাত হইছে। আমাকে বলে, লতু লতু করবা না!

তরুলতা উঠতে চাইলে আনাস সাহেব তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরলেন।
— তরু, কতবার বলেছি না, এত কাজ করো না। এই সময়ে বেশি উঠানামা করলে সমস্যা হয়।

তরুলতা মুচকি হেসে বললেন,
— আরে, এত চিন্তা করো না। কিছু হবে না। হাত-মুখ ধুয়ে এসো, খেতে দিই।

মেয়েরা মায়ের পিছু পিছু গেল।
— আজ কী রান্না করেছ মা?

এই প্রশ্নে তরুলতার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চোখের কোণে অজান্তেই জল জমে উঠল। কয়েক মাস ধরে ভাত আর ভর্তাতেই সংসার চলছে।

তিনি কষ্ট লুকিয়ে বললেন,
— আল্লাহ যেভাবে রাখেন, সেভাবেই চলতে হয় মা। নিজের অবস্থায় খুশি থাকতে হয়। আল্লাহ যে আমাদের তিনবেলা খাওয়াচ্ছেন, তাতেই আলহামদুলিল্লাহ।

ছোট্ট রাফা কী বুঝল কে জানে—এক দৌড়ে পুকুরে হাত-মুখ ধুতে চলে গেল।

আনাস সাহেব ঘরে এসে বিছানায় বসে চোখ বন্ধ করলেন। চিন্তা থেকে পালানোর ব্যর্থ চেষ্টা।

তিনি খেতে না আসায় তরুলতা খাবারের প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
— খেতে আসছ না কেন?

আনাস সাহেব কষ্টের হাসি হেসে বললেন,
— বুক ফাটে, তবু মুখ ফুটে না—এইটাই মধ্যবিত্ত। তিন মাস বেতন পাই না, আবার ইমাম মানুষ—আমাদের তো টাকার দরকারই হয় না! ইমামদের আবার টাকা লাগে নাকি?

তরুলতা সব বুঝলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— বাজার-সদাই কিছুই নেই। আমার জন্য না হোক, বাচ্চাগুলোর কথা তো ভাবতে হয়।

আনাস চুপ করে বসে রইলেন। তরুলতা ভাতের প্লেট সামনে এগিয়ে বললেন,
— এখন ওসব কথা রেখে খেয়ে নাও।
— তুমি খেয়েছো?
— হ্যাঁ।
— মিথ্যা কথা। মিথ্যা কথা বলতে নেই। মিথ্যে বললে পাপ হয়।

এই বলে আনাস সাহেব হাত ধুয়ে এক লোকমা ভাত তুলে বিসমিল্লাহ বলে স্ত্রীর মুখে তুলে দিলেন। স্বামীর এমন যত্ন দেখে মনের অজান্তেই তরুলতা চোখে মুক্তার মতো কী যেন চিকচিক করে উঠলো। এক লোকমা ভাত গালে নিতেই তরুলতার গা গুলিয়ে এলো। দৌঁড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আনাস সাহেব মাথায় পানি দিতে দিতে বললেন,
— খুব খারাপ লাগছে নাকি?

তরুলতা জবাব দিলেন,
— না, আমি ঠিক আছি।

আনাস সাহেব গম্ভীর স্বরে বলে গেলেন,
— কিছু টাকা পেলে তোমাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবো। ৪ মাস আগে যখন হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম, তখন তো ডাক্তার দেখে বললেন, বাচ্চার হার্টবিটে দুর্বলতা আছে। ওজনও বেশ কম। কী জানি, এখন কী অবস্থা! তোমাকে তো আর চেকআপে নিয়ে যেতে পারলাম না, তরু। আমাকে ক্ষমা করো। আমি একজন ব্যর্থ বাবা, ব্যর্থ স্বামী।

তরুলতা জবাব দিলেন,
— আহ! কী বলছো তুমি এসব? চুপ করো। আমি ঠিক আছি। আমাকে একটু ঘরে দিয়ে আসো। আমার মাথাটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসছে।

আনাস সাহেব স্ত্রীকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। পাশে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলেন। তরুলতা ঘুমিয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে যোহরের আজান ভেসে এলো। তিনি তড়িঘড়ি করে গোসল শেষ করে পাঞ্জাবিটা কোনোরকমে পরলেন। তারপর মা ও বড় মেয়েকে বলে আসলেন, তরুলতাকে যেন দেখে রাখে। তিনি তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। এই বলে মসজিদের দিকে রওনা হলেন। মসজিদে গিয়ে নামাজ শেষে মাদরাসায় ছাত্রদের পড়ালেন।

বিকেলে এক গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে গেলেন। রাকার মা বেশ কয়েকদিন ধরেই এমন অসুস্থবোধ করছেন। বমি বমি ভাব আরো বেড়েছে। মাথা ঘুরায়। খাবার একদমই খেতে পারেন না। শরীরটাও বেশ দুর্বল। গ্রাম্য ডাক্তারের চেম্বারে গেলে চারশত টাকার ওষুধ দিলেন। কিন্তু তার কাছে আছে মাত্র দুইশত টাকা। এদিকে পূর্বের বকেয়াও আছে। তাই ডাক্তারও তাকে এত টাকা বাকি রেখে ওষুধ দিতে চাইলেন না। উপায় না পেয়ে ওষুধ না কিনেই বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। ভাবলেন, আরো কিছু টাকা কোথাও থেকে জোগাড় করা যায় কিনা। তারপর এসে ওষুধগুলো নিয়ে যাবেন।

ফেরার পথে ফলের দোকানে কমলা দেখে হঠাৎ মেয়ের আবদারের কথা মনে পড়ল। ছোট্ট মেয়েটা পাশের বাসার একজনকে কমলালেবু খেতে দেখে আবদার করেছিল,
— আব্বুজি, আমাকে একটা কমলালেবু এনে দিবেন? খুব খেতে ইচ্ছে করছে।

কথাগুলো ভাবতেই আনাস সাহেবের চোখটা বন্ধ হয়ে এলো। ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আনমনে ভাবছিলেন, মেয়েটার জন্য কমলালেবু কিনে নিয়ে যাবেন। কিন্তু পকেটে যে মাত্র দুইশত টাকা। পরে এসে স্ত্রীর জন্য ওষুধ কিনবেন, নাকি এখনই ছোট্ট মেয়েটার আবদার রাখতে কমলালেবু? এসব ভেবে বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছিল আনাস সাহেবের। হঠাৎ কে যেন ডেকে উঠল,
— কী হে, আনাস সাহেব? কেমন আছেন?

পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন শ্যামলা গড়নের আধা-পাকা চুলের শার্ট-প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোক—অভিলাষ সেন। গ্রামের মাতব্বর। এলাকার খোঁজ-খবর সে ভালোই রাখে।

আনাস সাহেবকে একটু অন্যমনস্ক দেখে তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন,
— কী মিয়া, বললা না তো কেমন আছো? কী এতো ভাবছো? নাকি “তুমি” করে বলাতে বেজার হও?

আনাস সাহেব বললেন,
— না, না, ছিঃ ছিঃ। আপনি আমার বয়সে বড়। আপনি তুমি করে বললেই আমি খুশি হবো।

অভিলাস সেন মুচকি হেসে বললেন,
— আচ্ছা, তা এইখানে কী করো মিয়া?

আনাস সাহেব বিনীতভাবে উত্তর দিলেন,
— এই একটু দরকারে এসেছিলাম।

অভিলাস সেন আবার জিজ্ঞেস করলেন,
— ওহ! তা তোমার মাদরাসা কেমন চলে? এই মাসে বেতন পেয়েছো তো?

প্রশ্নটা শুনে আনাস সাহেবের মুখটা ছোট হয়ে এলো। তিনি কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। কীভাবেই বা বলবেন? একজন হিন্দু মানুষের সামনে কীভাবেই বা স্বীকার করবেন—একজন ইমামকে কতটা আর্থিক নির্মমতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। ইসলামে যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “শ্রমিকের প্রাপ্য তার ঘাম শুকানোর আগেই পরিশোধ করতে হবে”, সেখানে তিনি তিন মাস ধরে বেতন পান না—কখনো এই অজুহাত, কখনো সেই। যেহেতু অধিকাংশ মাদরাসাই বেসরকারি, তাই এ খাতে সরকারেরও তেমন বরাদ্দ নেই। মাদরাসা কমিটির মর্জিমাফিক চলে সবকিছু।

অভিলাস সেন খুবই বিচক্ষণ মানুষ। আনাসের নীরবতা দেখেই তিনি বুঝে গেলেন—এই মাসেও হয়তো বেতন মেলেনি। যদিও তিনি হিন্দু, তবু সব ধর্মের মানুষের প্রতিই তাঁর গভীর শ্রদ্ধা। ইসলাম ধর্মের ওপরও তার আলাদা একটা ভালো লাগা কাজ করে। তাছাড়া অজানা এক টানে আনাস সাহেবের প্রতি তাঁর আলাদা মমতা।

তিনি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললেন,
— আহ মিয়া, এই ফলগুলো একটু দেখো তো—তাজা আছে কিনা। আমার বাড়ির জন্য কিছু ফল বেছে দাও তো।

মুরব্বির কথা ফেলতে পারলেন না আনাস। তিনি মুরব্বির চাহিদামতো কিছু ফল বেছে দিলেন, তার মধ্যে কয়েকটি কমলালেবুও ছিল।

অভিলাস সেন দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— এইগুলার দাম কত?

দোকানদার উত্তর দিল,
— তিনশ টাকা।

অভিলাস সেন আর কিছু না বলে তিনশ টাকা মিটিয়ে দিলেন। তারপর ফলগুলো আনাসের হাতে দিয়ে বললেন,
— নেও মিয়া, এই ফলগুলো তোমার মাইয়ারে দিও। বইলো—এক খারাপ দাদাঠাকুর দিছে।

আনাস সাহেব অপ্রস্তুত হয়ে বললেন,
— আরে না কাকা, আপনি আমাকে ভালোবাসেন—এইটাই তো অনেক। এগুলো দেওয়ার দরকার নেই।

অভিলাস সেন মুচকি হেসে বললেন,
— এমনি দিচ্ছি না। মনে করো, ধার দিচ্ছি। সময়মতো ফেরত নিয়া নিমু। এখন নাও মিয়া, না হলে ভাববো—তুমি আমারে হিন্দু বইলা ঘেন্না করতাছো।

আনাস সাহেব হালকা হেসে বললেন,
— কাকা, আপনি আবার আমাকে কথার ফাঁদে ফেললেন। আবার আমাকে ঋণী করলেন।

অভিলাস সেন মিষ্টি হেসে তাঁকে বিদায় জানালেন।

হাতে কমলালেবু। মনে মেয়ের আবদারের মুখ। ছোট্ট ইচ্ছেটুকু পূরণ হবে—এই ভাবনায় আনাস সাহেবের মনটা হালকা হয়ে এলো। খুশি মনে তিনি বাড়ির পথ ধরলেন।

খুশি মনে বাড়ি ফিরেই সামনের দৃশ্যটা দেখে আনাস সাহেব চিৎকার করে উঠলেন—
— তরু! এই তরু!

তরুলতা মাটিতে পড়ে আছেন। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। জামা রক্তে ভিজে গেছে। রাফা, রাকা মায়ের হাত ধরে কান্না করছে। আনাস সাহেবের মা ঘটনার আকস্মিকতায় কী করবেন ভেবে উঠতে পারছেন না। রাকা কাঁদতে কাঁদতে বলল, হঠাৎ করে পেটে অনেক ব্যথা করছিল মায়ের। বমি করতে যাওয়ার সময় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছে।

দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পর তরুলতার অপারেশন হলো। ঘণ্টাখানেক পর অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।

আনাস সাহেব কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
— আমার স্ত্রী কেমন আছে?

ডাক্তার জবাব দিলেন,
— জি, ভালো আছেন।

— আলহামদুলিল্লাহ্। আর আমার বাচ্চা?

ডাক্তার মাথা নিচু করে বললেন,
— সরি… বাচ্চাটাকে বাঁচানো যায়নি। তিন দিন আগেই গর্ভেই মারা গেছে। পর্যাপ্ত খাবার পায়নি।

আনাস সাহেব নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করলেন। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল।
এই চোখের জল শুধু একজন বাবার নয়—এটা মধ্যবিত্তের, অবহেলার, নীরব বঞ্চনার কান্না।

Link copied!
Development by বিডি আইটি এজেন্সি