প্রকাশিত: ২৮ মে ২০২৬, ০৯:২৩ এএম
কোরবানির মাংস সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়: এক ভাগ পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের জন্য এবং এক ভাগ গরিব-দুস্থদের জন্য। অনেকে মনে করেন, কোরবানির মাংস ঈদের পরে বা তিন দিনের বেশি সময় সংরক্ষণ করা বৈধ নয়। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সময় ধরেও সংরক্ষণ করা জায়েজ। ফিলিস্তিনের আল-কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি ফিকহের অধ্যাপক হুসাম আল-দীন ইবনে মুসা আফানা বলেছেন, ‘বেশির ভাগ আলেমের মতে, কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সময় ধরে সংরক্ষণ করা বৈধ।’ এই মতামতের ভিত্তি হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর হাদিস, যেখানে প্রাথমিকভাবে মাংস সংরক্ষণের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও পরে তা রহিত করা হয়েছে।
হাদিসে কী আছে
কোরবানির মাংস সংরক্ষণসংক্রান্ত কয়েকটি বিশুদ্ধ হাদিস:
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘ঈদুল আজহার সময় মরুভূমির দরিদ্র মানুষ শহরে আসত। তখন রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘তিন দিনের জন্য প্রয়োজনীয় মাংস রাখো, বাকিটা দান করে দাও।’ পরে মুসলিমরা বললেন, আল্লাহর রাসুল, লোকেরা তাদের কোরবানির পশুর চামড়া দিয়ে মশক তৈরি করে এবং মাংসের চর্বি গলিয়ে রাখে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেন? তারা বললেন, আপনি তো তিন দিনের বেশি মাংস খাওয়া নিষেধ করেছেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, আমি এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলাম, কারণ সে সময় দরিদ্ররা এসেছিল। এখন তোমরা খেতে পারো, সংরক্ষণ করতে পারো এবং দান করতে পারো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৭১)
সালামা ইবনে আল-আকওয়া (রা.) বর্ণিত আরেকটি হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরবানির পশু জবাই করেছে, সে যেন তিন দিনের বেশি তার মাংস রাখা থেকে বিরত থাকে।’ পরের বছর মুসলিমরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমরা কি গত বছরের মতো করব?’ তিনি বললেন, ‘না। সে বছর মানুষের কষ্ট ছিল। তাই আমি চেয়েছিলাম, তোমরা অভাবীদের সাহায্য করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৬৯)
আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘হে মদিনার অধিবাসীরা, কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি খেয়ো না।’ পরে মুসলিমরা অভিযোগ করলেন যে তাদের পরিবারে শিশু ও সেবকেরা আছে, যাদের খাওয়ানো প্রয়োজন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘খাও, অন্যদের খাওয়াও এবং সংরক্ষণ করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৭২)
ওপরের হাদিসগুলোর ভিত্তিতে বেশির ভাগ আলেম—হানাফি, শাফিঈ, হানবালি ও মালিকি মাজহাবের পণ্ডিতেরা—একমত যে কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা জায়েজ। এই অনুমতি রাসুল (সা.)–এর পরবর্তী নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে, যেখানে তিনি মাংস সংরক্ষণের অনুমতি দিয়েছেন। আধুনিক সময়ে ফ্রিজার ও সংরক্ষণ প্রযুক্তির সুবিধার কারণে মাংস দীর্ঘদিন নিরাপদে রাখা সম্ভব এবং এটি শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকেও বৈধ।
সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যবহারিক পরামর্শ
১. নিয়তের বিশুদ্ধতা : মাংস সংরক্ষণের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পরিবারের প্রয়োজন মেটানো বা পরে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা। এটি শুধু অপচয় বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত নয়।
২. স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা: মাংস সঠিকভাবে পরিষ্কার করে উপযুক্ত তাপমাত্রায় ফ্রিজ বা ফ্রিজারে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে তা নষ্ট না হয়।
৩. দানের গুরুত্ব : কোরবানির মাংসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অভাবীদের মধ্যে বিতরণ করা উচিত, কারণ এটি কোরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য। সংরক্ষণের আগে এই দায়িত্ব পালন করা জরুরি।
৪. অপচয় এড়ানো : ইসলামে অপচয় নিষিদ্ধ। তাই এমন পরিমাণ মাংস সংরক্ষণ করা উচিত, যা যুক্তিসংগতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।
এই ঈদে আমরা যেন কোরবানির মাংস সঠিকভাবে বিতরণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি এবং সমাজে মানবিকতার বন্ধন আরও জোরদার করতে পারি।
সূত্র: অ্যাবাউট ইসলাম ডটনেট
