প্রকাশিত: ২৪ মে ২০২৬, ১১:২৭ পিএম
২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়া আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাসন ও আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ নেতারা দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। মাঠপর্যায়ে ঝটিকা মিছিল, গোপন বৈঠক এবং অনলাইন গ্রুপ খোলার মাধ্যমে দলীয় তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে 'সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬' পাসের পর সরকারের কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি এবং বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি জোটের তীব্র বিরোধিতার মুখে দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
পটভূমি: প্রজ্ঞাপন ও আইনি নিষেধাজ্ঞা
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১২ মে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গণহত্যা, গুম, দমন-পীড়ন ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অভিযোগে দলটির সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস হওয়ার পর দলটির প্রকাশ্য রাজনীতি কার্যত সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। এই সংশোধিত আইনের আওতায় রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ও গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত সংগঠনের কার্যক্রমের ওপর সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে তৎপরতা ও প্রশাসনিক অ্যাকশন
গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক সূত্রমতে, এপ্রিল ও মে মাসে খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অনানুষ্ঠানিক ও গোপন সাংগঠনিক কার্যক্রমের চেষ্টা চালানো হয়েছে। বড় কর্মসূচির বদলে জাতীয় দিবস বা সামাজিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কর্মীদের সক্রিয় করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। তবে এসব চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করছে প্রশাসন:
-
খুলনা: জিরো পয়েন্ট এলাকায় ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় ১১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে (নামীয় ৭৩ জন)।
-
যশোর: গোপন বৈঠকের অভিযোগে ৩০ এপ্রিল ৫ জন সাবেক এমপিসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
-
ঢাকা ও চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের জামিয়াতুল ফালাহ এবং ঢাকার গুলিস্তানে মিছিলের চেষ্টাকালে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।
-
টুঙ্গিপাড়া যাত্রা: গত ১২ মার্চ জিরোপয়েন্ট থেকে টুঙ্গিপাড়া শোভাযাত্রার চেষ্টাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীনকে গ্রেফতার করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্রগুলো স্পষ্ট করেছে যে, নিষিদ্ধ সংগঠনের পুনঃসক্রিয়তার যেকোনো প্রচেষ্টা রুখতে মাঠ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মূল্যায়ন
আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটকে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। লেখক ও ইতিহাস গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন: ‘আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরতে চায় কিনা আগে সেটি দলটিকে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, শীর্ষ নেতৃত্ব গুম-খুনের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করছে। বিদেশে বসে এখনো যেসব উগ্র বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো খোদ দলীয় কর্মীরাও ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না।’
তিনি আরও যোগ করেন: ‘দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কে দেবে সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। কয়েকটি অফিস খোলা বা বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিকে রাজনৈতিক পুনরুত্থান বলা যাবে না। অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত ও ছত্রভঙ্গ নেতাকর্মীরা নিজেদের উদ্যোগে এসব করার চেষ্টা করছেন।’
দলের ভবিষ্যৎ পথরেখা নিয়ে তাঁর মন্তব্য: ‘আওয়ামী লীগ যদি বাস্তব রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে চায়, তাহলে দলটির ভেতরে নেতৃত্ব, দায়বদ্ধতা ও অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বড় ধরনের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।’
রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর অবস্থান
১. কৌশল বদলে ‘হার্ডলাইনে’ বিএনপি
আওয়ামী লীগ ইস্যুতে শুরুতে কিছুটা কৌশলী অবস্থান নিলেও ২০২৬ সালের আইন পাসের পর বিএনপি এখন প্রকাশ্যেই দলটির পুনর্বাসনের বিরোধিতা করছে। বিএনপির ধারণা, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান তাদের ক্ষমতার সমীকরণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দলের ভাইস-চেয়ারমান শামসুজ্জামান দুদু স্পষ্ট ভাষায় বলেন: ‘কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে ফেরার সুযোগ দেবে না বিএনপি। কারণ, দলটি গণহত্যা ও গণতন্ত্র হত্যা করেছে।’
২. জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি-র হুঁশিয়ারি
আওয়ামী লীগের ফেরার সম্ভাবনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার অবস্থানে রয়েছে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন: ‘গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার চলছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ। কোনোভাবেই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টা জনগণ প্রতিহত করবে।’
একই সুর শোনা গেছে এনসিপির যুগ্ম-মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহীনের কণ্ঠে। তিনি বলেন: ‘গণহত্যা, গুম, দমন-পীড়ন ও অর্থপাচারের দায়ে অভিযুক্ত একটি দলকে রাজনীতিতে ফেরানোর প্রশ্নই ওঠে না। কেউ সেই চেষ্টা করলে রাজনৈতিকভাবে তার মূল্য দিতে হবে।’
তৃণমূলের হতাশা ও নেতৃত্বের দ্বিমত
দলটির ভেতরে এখন সবচেয়ে বড় সংকট নেতৃত্ব নিয়ে। তৃণমূলের কর্মীদের বড় অংশের অভিযোগ, বিতর্কিত ও গুম-খুন-দুর্নীতিতে অভিযুক্ত নেতাদের সামনে রেখে জনসমর্থন ফেরানো অসম্ভব। ভেতরে-ভেতরে ‘রিফর্মড আওয়ামী লীগ’ বা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নতুন নেতৃত্বের দাবি উঠলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখনো শেখ হাসিনাকেই মূল চালিকাশক্তি মনে করছে।
এই বিষয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন: ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ চলবে। তার কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি আরও বলেন: ‘আওয়ামী লীগকে রাজনীতির বাইরে রেখে গণতন্ত্রের আলাপ হাস্যকর। কর্মীদের নিরাপদে রেখেই আপাতত দলের কর্মকাণ্ড অবশ্যই বাড়ানো হবে। সে লক্ষ্যে কাজও চলছে। নতুন সরকার দেশে গণতন্ত্র চাইলে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির সুযোগ দেবে বলেও প্রত্যাশা তার।’
