শুক্রবার ১৬, জানুয়ারি ২০২৬

শুক্রবার ১৬, জানুয়ারি ২০২৬ -- : -- --

নির্বাচনের আগে বাড়ছে টার্গেট কিলিং, আতঙ্কে জনজীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম

গ্রাফিক্স: যায়দিন প্রতিদিন

নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, বাংলাদেশে সহিংসতার ধরন ততই বদলে যাচ্ছে—আর সেই বদলের সবচেয়ে আতঙ্কজনক রূপ হিসেবে সামনে এসেছে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ও হত্যাকাণ্ড, যা জনপরিসরে এখন “টার্গেট কিলিং” নামে পরিচিত। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত একের পর এক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক উত্তাপের সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি নির্বাচন ঘিরে আরও বড় সহিংসতার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

নির্বাচনী রাজনীতিতে সহিংসতার নতুন মাত্রা

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের হামলাগুলো আগের চেনা চিত্র থেকে আলাদা। গভীর রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া, মোটরসাইকেলে আসা মুখোশধারীদের হামলা, কিংবা নিরিবিলি স্থানে গুলি করে হত্যা—এ ধরনের ঘটনাগুলো একটি পরিকল্পিত ও সংগঠিত তৎপরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ভয় দেখাতে ও নিষ্ক্রিয় করতে সচেতনভাবেই এই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে।

একাধিক ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা, স্থানীয় প্রভাব এবং সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার তথ্য সামনে এসেছে। পরিবার ও সহকর্মীদের বক্তব্যেও ব্যক্তিগত বিরোধের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কথাই বেশি উঠে আসছে। এতে করে ধারণা জোরালো হচ্ছে, এসব হামলা বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের ভাষ্য, একের পর এক গুরুতর ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত তদন্ত, সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার কিংবা দৃশ্যমান আইনি অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। মাঠপর্যায়ে কার্যকর উপস্থিতির অভাব ও তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকায় জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছে—সব ঘটনাই তদন্তাধীন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। তবে এই বক্তব্য বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ সীমিত।

আতঙ্কের প্রভাব সমাজ ও অর্থনীতিতে

রাজনৈতিক সহিংসতার এই ধারা কেবল রাজনীতির পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই সন্ধ্যার পর চলাচল কমে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরা অনিশ্চয়তার কথা বলছেন; কেউই নিশ্চিত নন, পরিস্থিতি আরও কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা বিনিয়োগের জন্য বড় বাধা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির ইঙ্গিত পেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে ওঠেন। ফলে এই সহিংসতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অর্থনীতিতেও নেতিবাচক হতে পারে।

বিচারহীনতার ঝুঁকি

মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিটি লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, তদন্তে ধীরগতি এবং অপরাধীদের শনাক্তে ব্যর্থতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। অনেক ঘটনায় সাক্ষীরা ভয় বা চাপের কারণে মুখ খুলতে চান না; এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যেও ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে কি না—সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড দমন করতে না পারলে ভবিষ্যতে সহিংসতার পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে শুধু নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়বে।

নির্বাচনের আগে জরুরি করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—

  • দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত ব্যবস্থা: প্রতিটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় আলাদা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত টিম গঠন করতে হবে।

  • আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা: মাঠপর্যায়ে তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত তথ্য প্রকাশ ও ব্রিফিং নিশ্চিত করা জরুরি।

  • সব রাজনৈতিক দলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: প্রতিদ্বন্দ্বী সব দলের জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয়।

টার্গেট কিলিং এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি রাজনৈতিক সহিংসতার এমন এক রূপ, যা দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং নাগরিক নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। তদন্তের ধীরগতি, জবাবদিহির অভাব এবং বাড়তে থাকা রাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নির্বাচনের আগে যদি এই সহিংসতার স্রোত থামানো না যায়, তবে শুধু একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনই নয়—দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাও গভীর সংকটে পড়তে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সহিংস কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে, যার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে।

Link copied!
Development by বিডি আইটি এজেন্সি