শুক্রবার ১৬, জানুয়ারি ২০২৬

শুক্রবার ১৬, জানুয়ারি ২০২৬ -- : -- --

পাঠ্যবইয়ে ওঠে এসেছে ভোট ডাকাতির চিত্র

যাপ্র নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪০ এএম

চলতি শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ে প্রথমবারের মতো ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব পাঠ্যবইয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, ইতিহাস ও গণমানুষের প্রত্যাশা, স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা, শাসনতান্ত্রিক ঘটনাপ্রবাহ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তথ্য নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ের গুণগত মানও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা হয়েছে। সংশোধিত পাঠ্যবইগুলো বছরের প্রথম দিন থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালে প্রণীত পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবই পরিমার্জনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত বছর পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কবিতা, প্রবন্ধ, গদ্য ও গ্রাফিতি যুক্ত করা হয়েছিল, যা ছিল সাহিত্যের অংশ। এবার ইতিহাসের অংশ হিসেবে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে পরিমার্জন আনা হয়েছে এবং যুক্ত করা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান।

এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনায় বিষয়বস্তুর পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকলেও পর্যায়ক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে বিষয়বস্তুর কলেবর বাড়ানো হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণআন্দোলন’ অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণআন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে নতুন পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বর্ণনা রয়েছে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের ছবিও সংযোজন করা হয়েছে।

অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে আলাদা পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানেও নব্বই ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের বিষয় রয়েছে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা অবরোধের গণসমাবেশের একটি ছবিও সংযোজন করা হয়েছে।

নবম ও দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা পাঠে’ বলা হয়েছে—
“গণমানুষের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীনতা-উত্তর দেশে আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং সর্বজনীন মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে। এই প্রত্যাশা বারবার হোঁচট খেয়েছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব সরকার সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থেমে যায়।”

পাঠ্যবইয়ে আরও বলা হয়েছে,
“২০০৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ক্ষমতাসীন হয়ে শেখ হাসিনা স্থায়ীভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষের ওপর দমন-নিপীড়ন শুরু করেন। দুর্নীতির প্রসার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করার মাধ্যমে দলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ বেপরোয়া হয়ে ওঠে।”

এতে বলা হয়,
“এরই মধ্যে শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস্থা বাতিল করেন। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকার করলে শুরু হয় সংকট।”

ভোটারবিহীন ও ভোট ডাকাতির ইতিহাস তুলে ধরে পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে,
“২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার। এরপর ২০২৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার রোডম্যাপ করে আওয়ামী লীগ। জনগণ তাদের এই নীলনকশা প্রত্যাখ্যান করে।”

শেখ হাসিনার শাসনকে ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দিয়ে পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে,
“হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের অর্থনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক। ১৬ বছরে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার সম্পদ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে চোরতন্ত্র কায়েম করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও ভঙ্গুর করে দেওয়া হয়।”

জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে,
“চাকরিতে কোটা প্রথাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা চব্বিশের জুন থেকে আন্দোলন গড়ে তোলে।”
এই আন্দোলন দমন করতে
“ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ ঘোষিত), যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সরকারি বাহিনীর সঙ্গে জুলুম-নির্যাতন শুরু করে।”

এতে আরও বলা হয়,
“১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।”
এরপর
“লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।”
শেষ পর্যন্ত
“৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।”
পাঠ্যবইয়ে উপসংহারে বলা হয়েছে,
“নিপীড়ক শাসক যত শক্তিশালীই হোক, গণপ্রতিরোধে তার পরাজয় অনিবার্য।”

এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী আমলে পাঠ্যবইয়ে অযাচিতভাবে নানা তথ্য সংযোজন করা হয়েছিল এবং শেখ মুজিবকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমান পরিমার্জনে এসব অতিরঞ্জিত তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী যে নির্বিচার দমন-পীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, সেটিও তরুণ প্রজন্মের পাঠ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক ফাতিহুল কাদীর বলেন,
“বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ও জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) অনুমোদনের মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পাঠ্যবইগুলোর এই পরিমার্জন চূড়ান্ত করা হয়েছে।”

Link copied!
Development by বিডি আইটি এজেন্সি